ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ৪২ বছর: রাউজানে পূজনীয় শরণংকর মহাথেরর জন্মজয়ন্তী
বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ প্রতিবেদক:
পাহাড় আর আঁকাবাঁকা পথ ছাড়িয়ে রাউজানের বৃহত্তর হোয়ারাপাড়ার আকাশ ছেয়েছিল সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়ায়। অদ্বিতীয় গুণশালী বুদ্ধ ধাতু জাদী ও শরণংকর বুদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে সমবেত হাজারো মানুষের কণ্ঠে তখন একটাই সুর—‘সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু’ (জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক)।
গত ১৬ আগস্ট (রবিবার) এক অনন্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধার আবহে উদযাপিত হলো একালের অন্যতম প্রখ্যাত ধুতাঙ্গ সাধক পরম পূজনীয় ভদন্ত শরণংকর মহাথের মহোদয়ের ৪২তম জন্মজয়ন্তী।
এক ত্যাগী জীবনের পদযাত্রা:
১৯৮৪ সালের ১৬ আগস্ট রনি বড়ুয়া হিসেবে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ২০০৪ সালে বুদ্ধের পথে নিজেকে সমর্পণ করেন, ধারণ করেন ‘শরণংকর’ নাম। সাধারণ ভিক্ষুজীবন থেকে ছাড়িয়ে তিনি নিজেকে সঁপে দেন কঠিন ধুতাঙ্গ সাধনায়। প্রায় ৭,০০০ কিলোমিটার পথ খালি পায়ে হেঁটে বুদ্ধবাণী প্রচার এবং সুদীর্ঘ শ্মশান সাধনার মাধ্যমে নিজেকে আত্মসংযমের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর সাধারণ জীবনযাপন ও গভীর প্রজ্ঞা আজ লাখো মানুষকে আকর্ষণ করে।
ধর্মীয় উৎসব ও সংঘমনীষীদের মিলনমেলা:
এই দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজনে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধেয়ে এসেছিলেন ধর্মপ্রাণ উপাসক-উপাসিকারা। অনুষ্ঠানটি এক মহাসম্মেলনে পরিণত হয়। এ সময় আসন অলঙ্কৃত করেন দেশের শীর্ষ ভিক্ষুসংঘবৃন্দ।
এছাড়াও
সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের ২৯তম সংঘনায়ক অধ্যাপক বনশ্রী মহাথের,
আশীর্বাদক হিসেবে বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভার উপসংঘনায়ক সদ্ধর্মরশ্মি রতনশ্রী মহাথের, প্রধান সদ্ধর্মদেশক হিসেবে ভদন্ত সুনন্দ মহাথের, বিশেষ অতিথি হিসেবে ভদন্ত জ্ঞানানন্দ মহাথেরসহ
উদ্বোধক হিসেবে ভদন্ত সুমিত্তানন্দ মহাথের মহোদয় উপস্থিত ছিলেন।
উৎসবের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ক্ষণ ছিল পূজনীয় ভদন্ত শরণংকর মহাথের মহোদয়ের নিজস্ব দেশনা। তিনি ভক্তদের উদ্দেশে বুদ্ধের ‘দ্বাদশ কর্ম’, জীবনের ‘কর্মবিপাক’ এবং সুনির্দিষ্ট ‘কর্মফল’ বিষয়ে প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা দেন। কেবল পুজো-প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি মানুষকে সত্য, মৈত্রী ও অহিংসায় বলীয়ান হয়ে সৎকর্ম সম্পাদনের আহ্বান জানান তিনি।
সন্ধ্যায় শত শত প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে জাদী প্রাঙ্গণ। সমবেত কণ্ঠে বিশ্বশান্তি, দেশের সমৃদ্ধি এবং পূজনীয় শরণংকর মহাথের মহোদয়ের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে প্রার্থনা জানানো হয়। ত্যাগ, সাধনা আর বিশ্বমৈত্রীর এই বারতা রাউজানের পাহাড়ঘেরা এই প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে হাজারো মানুষের হৃদয়ে।
মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।